Home / Article / বিজ্ঞাপনের কাকা-মামা-মাসি

বিজ্ঞাপনের কাকা-মামা-মাসি

‘আজি হইতে প্রায় ২০-২৫ বছর পূর্বের কথা… সে এক বিরাট ইতিহাস! মফস্বলের এক যুবক- নাম আদনান। কী যেন কী মনে করিয়া সে ঢাকায় আসিল। তাহার ক্ষণিক বাদে তড়তড়াইয়া তাহার উত্তরণ! আর এখন তো বলিতে হয়- সে চট করিয়া আসিয়া পট করিয়া বিজ্ঞাপনের হর্তাকর্তা বনিয়া গিয়াছে!’
– বঙ্কিমীয় ভাষায় এমন একটা গল্প দিয়ে আজকাল কোনো লেখা বা কারো ক্যারিয়ার স্টোরি শুরু করা যায় কিনা জানি না… তবে হলফ করে বলা যায় কোনো অ্যাড এজেন্সি গাই-এর গল্পই এমনটা হবে না। আদনানের তো নয়ই!

একদিকে তো সেই একেলে ছেলের গল্প সেকেলে ঢঙে! তার ওপর আবার আদনানের এই ক্যারিয়ারে আসা ও জম্পেশ জমে যাবার গল্প বা যুদ্ধটা এত সহজ ছিল না। ভার্সিটি থেকে কেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর। কিন্তু তারপর… হ্যাঁ, চাকরি সবাই খোঁজে, আদনানও খুঁজেছিল… তবে ক্রিয়েটিভ বলে কথা! সব চাকরি তো তাকে মানায় না। তার দরকার ছিল ভিন্ন কিছু… অন্যরকম একটা প্রফেশান। কিন্তু ঢাকায়? মামা ছাড়া? এমন ভাবনায় আঁতকে ওঠার ঠিক একটু বাদেই আদনানের দিমাগ-কা-বাত্তি জ্বইলা উঠল… আইডিয়া… বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রি… শুধু ক্রিয়েটিভ হতে হয় কিন্তু মামা লাগে না, আর মামা থাকলেও কাজে আসে না- বরং নিজেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়!

পুনশ্চঃ গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকার পর আদনানের ধারণা পাল্টেছে। এখন ‘অ্যাডম্যান’ (আমরা যে নামে ওকে ডাকি)… ঐ হলো একই কথা ‘আদনান’… বিশ্বাস করে এই ইন্ডাস্ট্রিতেও মামা… আই মিন এম এ এম এ… মামা লাগে। অ্যান্ড ইটস ট্রু!

আসল কথায় আসি। বিশ্বজুড়ে অনেক অ্যাডম্যান-ই বেশ কিছু মামা, চাচা এমনকি মাসি নিয়ে সেই আদিকাল থেকে এখনও আলোচনা করেন। তাদেরকে নিয়ে গল্পগুলো অ্যাডম্যানদের কাজেও লাগে। নানাভাবে এসব আত্মীয়দের কাজে লাগিয়ে তাদের ব্র্যান্ড-এর যথেষ্ট লাভও হয়! এমনই ক’জন হলেন আন্ট জেমিমা, আঙ্কেল বেন, আঙ্কেল স্যাম। এরা সবাই বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড মাসকট হিসেবে সুপরিচিত।

aunt-jemima-lawsuit-105

আন্ট জেমিমা

উনবিংশ শতাব্দীর ৯০-এর দশকের শুরুর দিকে আন্ট জেমিমার জন্ম হয়। তবে বাস্তবে নয়, ব্র্যান্ড মাসকট হয়ে মিথ চরিত্র হিসেবে। মাথায় বান্দানা ও শরীরে অ্যাপ্রন পরিহিতা একজন আফ্র-আমেরিকান মহিলার ইলাস্ট্রেশান শোভা পেতে থাকে একটি কোম্পানির প্যানকেক মিক্স-এর কৌটোগুলোতে। পণ্যের নামও দেয়া হয় তারই নামে- আন্ট জেমিমা প্যানকেক মিক্সড এন্ড সিরাপ। অনেকের মতে আফ্র-আমেরিকান মানুষদের সম্পর্কে আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত হিসেবেই নাকি এই চরিত্রটির আবির্ভাব।

ক্রিস রাট নামে এক সংবাদকর্মী ও ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা এই চরিত্রটির স্রষ্টা। তিনি ও তার পার্টনার চার্লস আন্ডারউড প্যানকেক মিক্সড-এর ব্যবসায় নামলেও তখনও কোনো নাম ঠিক করতে পারেননি পণ্যের জন্যে। এরই মধ্যে একদিন সন্ধ্যায় ক্রিস রাট একটি ভ্যারাইটি শো দেখছিলেন। আর এ সময় আন্ট জেমিমা শিরোনামে একটি গান পরিবেশন করছিলেন বান্দানা হেডব্যান্ড ও আপ্রন পরিহিতা এক কালো মহিলা। গানটা এতই ভালো লেগেছিল যে রাট তাদের প্যানকেক মিক্স পণ্যটির জন্য তার নামটিই বেছে নেন। এরপর ক্রিস রাট ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার চার্লস আন্ডারউড তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে জেমিমা প্যানকেক মিক্সড এন্ড সিরাপ উৎপাদন শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে রাট ও আন্ডারউড ডেভিস মিলিং কোম্পানি-এর কাছে পণ্যটির স্বত্ব বেচে দেন। এই প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য আন্ট জেমিমার জীবন্ত ট্রেডমার্ক হিসেবে তাদের কোম্পানিতে ন্যান্সি গ্রিন নামে ৫৯ বছর বয়স্ক এক আফ্র-আমেরিকান মহিলাকে চাকরিও দেন। তারপরও আন্ট জেমিমা শিল্পীর আঁকা একটি কল্পিত ছবি- নিজস্ব পরিচয়ে এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হয়েই রইলেন আমাদের সবার কাছে। বর্তমান সময়ে এই পণ্যটি বাজারজাত করছে কোয়াকার ওটস কোম্পানি।

বিংশ শতাব্দীর ৫০-এর দশকের শুরুর দিকে এই চরিত্রটার মধ্য দিয়ে আফ্র-আমেরিকান মহিলাদেরকে নেগেটিভলি উপস্থাপনের অভিযোগ তোলেন কিছু সমালোচক। তারই সূত্র ধরে ৫০ ও ৬০-এর দশকে এবং সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে চরিত্রটির একটু পরিবর্তন এনে আরেকটু সময়োপযোগী ও আধুনিক করা হয়েছে আন্ট জেমিমাকে।

তবে তিনি আছেন আজও, হয়ত থাকবেন আগামী দিনেও শতাব্দী শতাব্দী পেরিয়ে। থাকবেন সহস্র অ্যাডম্যান ও ব্র্যান্ড-এর প্রেরণা হয়ে।

Uncle Ben

আঙ্কেল বেন

কোট ও বো-টাই পরিহিত এক ষাটোর্ধ আফ্র-আমেরিকান ভদ্রলোকের মিথ চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হন আঙ্কেল বেন। সময়টা ১৯৪৬। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে। আঙ্কেল বেন’স ব্র্যান্ডের চাল ও অন্যান্য খাদ্য সামগ্রীর ব্র্যান্ড মাসকট হিসেবে সুপরিচিত তিনি।

মূলত ১৯৪৩ সাল থেকে কনভার্টেড রাইস ইনকর্পোরেশন-এর অধীনে বাজারে চাল বিক্রি শুরু হলেও পরে মার্স ইনকর্পোরেশন আঙ্কেল বেন’স ব্র্যান্ডটি কিনে নেয়। ১৯৫০ সাল থেকে বিংশ শতাব্দীর বাকিটা জুড়ে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিক চাল বিক্রেতা হিসেবে নিজেদের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে তারা। এ সময় ধরে ধীরে ধীরে অনেক জনপ্রিয় হয়েছে আঙ্কেল বেন।

অনেকে বলেন যে, আসলে বো-টাই পরিহিত আঙ্কেল বেন ছিলেন শিকাগো শহরের এক হোটেলে কর্মরত আফ্র-আমেরিকান ভদ্রলোক ফ্রাঙ্ক ব্রাউন। তবে মার্স-এর মতে আঙ্কেল বেন ছিলেন একজন আফ্র-আমেরিকান চাল উৎপাদনকারী, যিনি তার উৎপাদিত চালের উচ্চমানের জন্য সবার কাছে খুবই সমাদৃত ছিলেন। এমন পরস্পরবিরোধী নানা গল্প আছে আঙ্কেল বেনকে নিয়ে। তবে আঙ্কেল বেন চরিত্রটির জন্ম যেখান থেকেই হোক না কেন, সবচেয়ে বড় সত্যি হলো তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন একটি বড় ব্র্যান্ডকে, ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকে।

আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- ২০০৭ সালে মার্স-এর মালিকানাধীন আঙ্কেল বেন ইনকর্পোরেশন-এ কাল্পনিক চেয়ারম্যান করা হয়েছে আঙ্কেল বেনকে। ব্র্যান্ড-এর ওয়েবসাইটে তার একটি ভার্চুয়াল অফিসও আছে।

Unclesamwantyou

আঙ্কেল স্যাম

আঙ্কেল স্যাম বিজ্ঞাপনের এক অতি জনপ্রিয় নাম। তাকে প্রথম এঁকেছিলেন জেমস মণ্টগোমেরি ফ্লাগ। পাতলা গড়নের চেহারা, ঈষৎ লম্বাটে চুল, একগুচ্ছ দাড়ি… মাথায় মার্কিন ব্লু কালার স্টার-সম্বলিত হ্যাট, পরনে দারুণ কেতাদুরস্ত কালো মখমলের টপকলারবিশিষ্ট নেভি কাটআওয়ে টেইলর কোট, তার নিচে ফর্মাল সাদা শার্ট, গলায় লাল রঙের বো-টাই… এই হলেন আঙ্কেল স্যাম! তবে অনেকের মতে নিচের অংশে তাঁর পরনে থাকবে ঐতিহ্যবাহী হিকোরি রঙের ডোরাকাটা ট্রাউজার, আবার কারো কারো মতে লাল-সাদা ডোরাকাটা ট্রাউজার! এসব নানা বিতর্কের কারণে ছবিতে এখন আর তাঁর নিচের দিকটা আঁকা হয় না। তবে মোদ্দা কথা হলো তাঁর পোশাকে সবসময় থাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীকী রঙগুলো- লাল, সাদা ও নীল। কারণ দেশের সর্বসাধারণের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ব্যক্তিরূপ প্রকাশ হলেন এই আঙ্কেল স্যাম। তিনি জাতীয় দায়িত্ব ও অহংকারের প্রতীক। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তিনিই ডাকেন ‘দেশের জন্যে তোমরা এসো, মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দাও’। অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব তার, দৃপ্ত চাহনি, কথা বলে চোখে চোখ রেখে, আঙুলের ইশারা থাকে ঠিক দর্শকের চোখ বরাবর… সাড়া মেলে তার ডাকে।

তবে আঙ্কেল স্যাম কেবলই যুক্তরাষ্ট্রের রূপক নাকি সত্যিকার অর্থেই আঙ্কেল স্যাম বলে কেউ ছিলেন সেটা নিয়েও নানা বিতর্ক আছে। বলা হয়ে থাকে যে, ১৭৭৫ সালে বৈপ্লবিক যুদ্ধের সময় ‘ইয়াঙ্কি ডোডল’ গানের লিরিকে প্রথম আঙ্কেল স্যামের কথা বলা হয়েছিল। অতীত লিজেন্ডদের মত অনুসারে ১৮১২ সালের যুদ্ধে প্রথম আঙ্কেল স্যামের নাম ব্যবহার করা হয়। আর সম্ভবত এই নামটি এসেছে স্যামুয়েল উইলসনের নাম থেকে। জানা যায়, স্যামুয়েল উইলসনের জন্ম ম্যাসাচুসেটস শহরে। তবে ২২ বছর বয়সে তিনি এবং তাঁর বড় ভাই (২৭ বছর) হলেন হাডসন নদীর তীরে ট্রয়ে নিউইয়র্ক-এর প্রথম সেটলার বা বসবাসকারী। তারা ছিলেন সল্পসময়ে অনেক বড় ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা ও অন্যদের জন্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ স্রষ্টা।
১৮১৬ সালে ফ্রেডেরিক অগাস্টাস ফিদফ্যাডি তাঁর ‘দ্য অ্যাডভেন্সার অব আঙ্কেল স্যাম ইন সার্চ আফটার হিজ লস্ট অনার’  বইয়ে আঙ্কেল স্যামের কথা বলেছেন।

যেহেতু কলম্বাস প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন তাই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রতীক ধরা হতো। ১৮১২ সালে মার্কিন বৈপ্লবিক যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রাদার জনাথনের নাম আসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে। এরপর আঙ্কেল স্যাম-এর কথা শোনা যায়। তবে ১৮৯৩ সালের ‘দ্য লুথেরান উইটনেস’ মতে আঙ্কেল স্যাম ও ব্রাদার জনাথন একই ব্যক্তি। রাজনীতিতে যিনি আঙ্কেল স্যাম, সমাজে তিনিই ব্রাদার জনাথন।

১৯৮৯ সাল থেকে কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে আঙ্কেল স্যামের জন্মদিন অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বরকে ‘আঙ্কেল স্যাম ডে’ ঘোষণা দেয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পোস্টারে, বিজ্ঞপনে আজও জ্বলজ্বল করেন মার্কিনীদের এই দেশপ্রেমিক আঙ্কেল। আঙ্কেল স্যাম!

 

মাহবীর মুরাদ
অ্যাসোসিয়েট ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, এক্সপ্রেশানস লিমিটেড

advertising archive bangladesh