Home / Article / একটি বিজ্ঞাপন ও আমাদের ‘সৌন্দর্য’ ভাবনা

একটি বিজ্ঞাপন ও আমাদের ‘সৌন্দর্য’ ভাবনা

Meril Splash - Fresh is beautiful BB

সুন্দরের ধারনায় গড়পড়তা মানুষ আমরা, মুখে ও মনে এক হতে পারিনি কোন দিন। সে সমাজের যে কোন স্তরে হোক। আমাদের দীর্ঘ দিনের বৈষম্যমূলক মানসিকতা এবং সেই মানসিকতার দুর্বলতার সুযোগকে পুঁজি করে ত্বক ফর্সা করার একের পর এক পণ্য বাজারে এসেছে। বেশির ভাগ বিজ্ঞাপনের মূল বক্তব্য – সাফল্যের প্রধান শর্ত ফর্সা-সুন্দর-উজ্জ্বল ত্বক। তাই সাম্প্রতিক সময়ে আড্ডা- টকশোতে নারীর ক্ষমতায়ন ইস্যুতে কথা উঠলেই প্রায় অবধারিত ভাবে এসে পড়ছিল ফর্সা-কালো’র বিতর্ক এবং এইসব বিজ্ঞাপনের ভূমিকা। অদূর ভবিষ্যতে এই বিতর্ক নিস্পত্তি হবে, এমন আশা এখনি করা যাচ্ছে না।

তবে সাবান ব্র্যান্ড মেরিল স্প্ল্যাস এর ক্রিয়েটিভ এজেন্সি সান কমিউনিকেশন তাদের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনে ‘সুন্দরের মানে কী শুধুই ফর্সা?’ এই প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে। বিজ্ঞাপনটি বিভিন্ন মাধ্যমে সম্প্রচারে যাবার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দ্রুত দর্শক প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে। এই প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত মোটামোটি পজেটিভ বার্তা দেয়। কারন হাজারো ‘লাইক’-এর পাশাপাশি কমেন্টগুলোতে আছে তাদের আবেগের, ভাললাগার বহিঃপ্রকাশ। অনেকে বলেছেন বিজ্ঞাপনে তিশা’কে কেন ফর্সা দেখানো হয়েছে, বা তিশাকে মেকআপ ছাড়া রাখলে ভালো হত, কিন্তু মোটকথা বিজ্ঞাপনটির মর্মার্থ – ‘যে কোন বর্ণের মানুষই সুন্দর হতে পারে, ফ্রেশ মানেই সুন্দর’ এর সাথে দ্বিমত করেননি। বিজ্ঞাপনটিকে দর্শক যখন এভাবে গ্রহন করলো তখন এই ব্র্যান্ড বা বিজ্ঞাপনের পিছনের মানুষ যারা তারা কি ভাবছেন তারই আঁচ নিতে আড্ডায় বসা সান কমিউনিকেশনের অফিসে।

 

ক্রিয়েটিভ টিমের কাউকে কাউকে মনে হলো এখনও বেশ ঘোরের মধ্যে আছেন, পাশাপাশি বোঝা গেছে কেম্পেইনের সাথে টিমের একাত্ত্বতা। কেম্পেইনের প্রাথমিক এই সাফল্যে তাদের একই সাথে ‘ভালো লাগে, গর্ব লাগে আবার ভয়ও লাগে।’

ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভির হোসেন যখন বলেন- ‘আমরা খুব ইউনিক ক্রিয়েটিভ কিছু করছি এটা মনে হয় না। আমাদের মনে হয় আমরা এমন একটা বিষয়ে কথা বলা শুরু করছি যেটা নতুন, যেই বিষয়টা নিয়ে কথা হউক এই অপেক্ষায় ছিল মানুষ। এর চেয়ে অনেক ক্রিয়েটিভ বিলবোর্ড আমরা দেখছি, আপনারা দেখছেন। কিন্তু এই বিলবোর্ডটার ছবি তুলে মানুষ যখন ফেসবুকে শেয়ার করছে তখন বুঝতে হবে তারা এই বিষয়টার সাথে একাত্ত্ব’।

ফেসবুকে নির্মাতা ফারুকি’র মন্তব্য পুরো টিমের মনের কথার প্রতিধ্বনি – ‘এই কাজটার মূল স্পিরিট এমন কিছু যেটা আমি নিজে বিশ্বাস করি! মেরিল স্প্ল্যাশ সোপের এই টিভিসিটা সেই রকম একটা কাজ যেটার মূল বক্তব্যের সাথে আমার মনের আর মতের মিল আছে।‘

এ তো গেলো যা হয়ে গেছে সেই গল্পের অংশ বিশেষ – যার ফসল এখন বিভিন্ন মিডিয়াতে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু কেম্পেইন এর ভবিষ্যৎ নিয়ে টিম কি ভাবছে?

একেবারে বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা আনন্দ খেলে গেলো তাদের চোখে-মুখে। আনন্দ এই জন্য যে তার ভাবেননি সাধারন মানুষ এত সহজে কেম্পাইনটা নিজের করে নেবে। বললেন – ‘আমাদের মাঝে মাঝে মনে হয় এইটা আমাদের আর হাতে নাই। এটা এখন পাবলিক প্রোপার্টি হয়ে গেছে। … আসলে এই পুরো কেম্পাইনটা এখনও আমাদের কাছে একটা লার্নিং স্টেজে আছে, সবাই শিখছি।’

স্কয়ার টয়লেট্রিজ এর হেড অব মার্কেটিং মালিক মোহাম্মাদ সাইদ এর বক্তব্য হচ্ছে ‘সাবান বিক্রি নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না। আসেন আমরা চিন্তা করি সামাজিক পরিবর্তনের যে সূচনা করছি সেটা ঠিকঠাক মতো কি ভাবে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারি।’

আড্ডা শেষ টানতে গিয়ে তানভীর বললেন – রেস্পন্সিবিলিটিটা অনেক বড় মনে হচ্ছে। আমাদের প্রতিনিয়ত ব্র্যান্ডের প্রতি, ক্রেতা বা ভোক্তার প্রতি সৎ এবং সতর্ক থাকতে হচ্ছে। যেন পরবর্তী পর্বে এই সততা বিচ্যুত হয়ে না যায়।n তাদের মনে কষ্ট না দিয়ে ফেলি।’

সান কমিউনিকেশন টিমের সাথে আড্ডা শেষ করে বেরিয়ে আসলাম। আড্ডায় dark is beautiful নন্দিতা দাসের ক্যাম্পেইন প্রসঙ্গ, রবীন্দ্রানাথের ‘কৃষ্ণকলি’ প্রসঙ্গ মাথায় ঘুরছে। বাসায় ফিরে আবার দেখলাম dark is beautiful । পরিসরের দিক থেকে হয়তো dark is beautiful অনেক বড় কেম্পেইন হবে কিন্তু বক্তব্যের দিক থেকে মেরিলের ‘ফ্রেশ মানেই সুন্দর’ বিজ্ঞাপনটি – dark is beautiful এর চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাবার সম্ভাবনা। কারন মেরিল স্প্ল্যাশ ডার্ক বা ফেয়ার কোন একটি গাত্র বর্ণের পক্ষ না নিয়ে বরং সব বর্ণের মানুষকে সফল ভাবে সুন্দর বলার চেষ্টা করছে।

শেষ করি ফেসবুক ফেনপেজ এর এক সরল জিজ্ঞাসা মন্তব্য দিয়ে। রেশমা আহমেদ জেবা লিখেছেন – ‘(বিজ্ঞাপন) অসাধারন লাগলো কিন্ত তবুও মানুষ কি বদলাবে বা বের হয়ে আসবে পুরোনো ধ্যান ধারণা থেকে’। পাঠক, আপনি কি মনে করেন?

 

advertising archive bangladesh